ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বানে আয়োজিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সোমবার (২০ জুলাই) ব্যাপক উত্তেজনা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও সমর্থক সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের ওপর টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও নির্মম লাঠিচার্জ চালিয়েছে দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ)। এ সময় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকাগুলো।
প্যাটেল চৌক ও কনট প্লেসে তীব্র সংঘর্ষ
সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার মূল প্রবেশপথ সংসদ স্ট্রিট, কনট প্লেস এবং প্যাটেল চৌক মেট্রো স্টেশন এলাকায় সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিশাল পদযাত্রা বের করেন।
পদযাত্রাটি কনট প্লেস থেকে জনপথ হয়ে সংসদ মার্গের দিকে পৌঁছালে পুলিশ আগে থেকে বসানো একাধিক ব্যারিকেড দিয়ে পথ অবরুদ্ধ করে। উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারগ্যাস শেল নিক্ষেপ করে ও নির্বিচারে লাঠিচার্জ চালায়। এতে চারদিকে হুড়োহুড়ি লেগে যায়; নিজেকে রক্ষা করতে অনেক শিক্ষার্থীকে রাস্তার পাশে থাকা যানবাহনের আড়ালে আশ্রয় নিতে দেখা যায়।
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গুরুতর আহত বহু
শিক্ষার্থী সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) অভিযোগ করেছে, পুলিশের হামলায় তাদের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক নেতা রোভিনের বাম হাত ভেঙে গেছে। এছাড়া একাধিক কর্মীর কাঁধ, পিঠ ও পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, নারী বিক্ষোভকারীদের ওপরও পুরুষ পুলিশ সদস্যরা বেপরোয়াভাবে লাঠিচার্জ করেছেন।
টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত এক আন্দোলনকারী জানান, সকাল থেকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চলছিল। তবে চারদিক থেকে ঘেরাও করে টিয়ারগ্যাস ছোড়ায় পালানোর মতো সুরক্ষিত পথও ছিল না।
মোদি সরকারকে সিজেপি ও বিরোধীদের কড়া সমালোচনা
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে সিজেপি। দলটি প্রশ্ন তোলে, “এটি কি কোনো যুদ্ধক্ষেত্র? শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কেন টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে?”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে তারা আরও লেখে, “আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আমরা আর গণতন্ত্রে বাস করছি না? এক মাস ধরে সরকার এই আন্দোলন উপেক্ষা করেছে, আর এখন আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলে আমাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।”
এই ঘটনায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের বিরোধী দলের নেতারাও। শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরে বলেন, “যখন একটি সরকার উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলনরত তরুণদের দিকে অস্ত্র তাক করে, তখন বোঝা যায় সেই সরকার তরুণবিরোধী।” শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে এমন কঠোর পদক্ষেপ বৈশ্বিক দরবারে ভারতের গণতন্ত্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও মুখপাত্র রাজীব রঞ্জন এক বিবৃতিতে সবাইকে শান্ত থাকার ও আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে এবং যেকোনো ধরণের সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে।
প্রসঙ্গ: বাংলাদেশের চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান
ভারতের এই শিক্ষার্থী আন্দোলন ও তা দমনের চিত্র স্মরণ করিয়ে দেয় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে ঘটা ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে। সে সময় তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনী একইভাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও গুলি চালিয়েছিল। তবে অসীম সাহস ও হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের মুখে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে এবং আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।


মন্তব্যসমূহ