পাকিস্তানে মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় নিহত ১৬

  পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কোহাট পুলিশ লাইন্সের একটি মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালে সংগঠিত ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৫০ জনেরও বেশি মানুষ। আজ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) জুমার নামাজের সময়ে পুলিশ সদর দফতরের কাছে এই হামলাটি চালানো হয়। খাইবার পাখতুনখোয়ার পুলিশ প্রধান (আইজি) জুলফিকার হামিদ ঘটনার সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। হামলার ধরণ ও পুলিশের পাল্টা অভিযান প্রথম হামলা: পুরোনো পুলিশ লাইন্সের প্রবেশপথে বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয় এক হামলাকারী। এতে বড় ধরণের বিস্ফোরণ ঘটে এবং ভবনের একাংশ ধসে পড়ে। দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ও বন্দুকযুদ্ধ: বিস্ফোরণের পরপরই সশস্ত্র জঙ্গিরা স্পেশাল ব্রাঞ্চ ভবন লক্ষ্য করে এগোতে থাকে। সেখানে একজন আত্মঘাতী হামলাকারী নিজেকে উড়িয়ে দেয়। এরপরই নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সমর্থিত জঙ্গিদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়। সন্ত্রাসী হতাহত: পুলিশ জানায়, মোট ৭ জন সশস্ত্র জঙ্গি পুলিশ লাইন্সে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে...

রোহিঙ্গা ইস্যু: স্বজনহারা বাবার অশ্রু মুছে দিচ্ছে বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান!

বাবার কোলে এই শিশুটির এখনো কিছু বোঝার বয়স হয়নি। বয়স মাত্র সাড়ে ১০ মাস। তার মাকে মিয়ানমারের হায়েনারা তার কাছ থেকে চিরদিনের জন্য আলাদা করে দিয়েছে। শিশুটি হাজারো ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গা শিশুদের একজন, যারা স্নেহমাখা হাতের ছোঁয়া থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হয়েছে। তার জীবিত আত্মীয় বলতে তার বাবাই আছেন। পরিবারের সাত সদস্যকে হারিয়ে কান্নাই বাবা মাওলানা আয়ুবুল ইসলামের শেষ অবলম্বন। কিন্তু মা-হারা শিশুটি তার বেঁচে যাওয়া বাবার চোখে অশ্রু দেখতে চায় না। তাই বাবাকে কাঁদতে দেখলেই কচি হাতের স্পর্শে বাবার অশ্রু মুছে দিচ্ছে। অনিশ্চিত গন্তব্যে পা বাড়ানো এই শিশু জানে না সে এখন কোথায়। স্বভাবত বাবার কোলটি চিনলেও সে বোঝেনি তার মা-সহ আত্মীয়রা কোথায়। সর্বস্ব হারিয়ে শিশুটিকে নিয়ে জন্মভূমি মংডুর কেয়ারিপ্রাং ছেড়ে বাবা আশ্রয় নিয়েছেন একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে।
শিশুটির বাবা মাওলানা আয়ুবুল ইসলাম শোনালেন সেই লোমহর্ষক কাহিনী। রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। অক্টোবরের ১২ তারিখে মংডুর কেয়ারিপ্রাংয়ে সেনাবাহিনীর গণহত্যায় এই পরিবারের সাত সদস্য নিহত হন। বর্বর সেনাবাহিনী অবলা নারী-শিশুদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লাশগুলো টুকরো টুকরো করে মাটিচাপা দেয়। কর্তিত হাতের বালা দেখে স্বামী স্ত্রীর লাশ শনাক্ত করেন। শিশুটির বাবা এসব লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে কাঁদছিলেন অঝোর নয়নে। কোলে বসে নির্বাক শিশুটি বাবার চোখের অশ্রু কচি হাতে মুছে দিচ্ছে।
অপর শিশু ফারজানা। বয়স সবে ১৭ মাস। মায়ের কোলে বসে নির্বাক তাকিয়ে আছে। অনিশ্চিত গন্তব্যে পা বাড়ানো ফারজানা জানে না সে এখন কোথায়। স্বভাবত মায়ের কোলটি চিনলেও সে বোঝেনি তার মা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন? সর্বস্ব হারিয়ে শিশুকে কোলে নিয়ে জন্মভূমি ছেড়ে মা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। সর্বহারা এসব রোহিঙ্গা শিশুর ঠিকানা কোথায় আজ?
শিশু ফারজানার মা আয়েশা আকতার (২৫)। শোনালেন দেশ ত্যাগের আগমুহূর্তের সেই লোমহর্ষক কাহিনী। রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। নির্যাতনের সীমা অতিক্রম করে আইয়ামে জাহেলিয়াতকে হার মানিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরেরা।
টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত ক্যাম্পে কথা হয় মিয়ানমার থেকে সদ্য আসা বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে। তাদের মধ্যে শিশু ফারজানার মা আয়েশা বেগমও ছিলেন। যিনি কাঁদছিলেন অঝোর নয়নে।
আয়েশা বেগম জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে মিয়ানমারের মিলিটারির খুন ও ধর্ষণ। মিলিটারি আসার খবর পেলে কোনো এক নির্জন জায়গায় লুকিয়ে থাকতেন তারা। এভাবে কয়েক দিন পার হয়, কিন্তু তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মিলিটারি ও তাদের দোসরেরা প্রথমে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। পরে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি সব ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা বলেন, চোখের সামনে নিজের স্বামীকে ধরে নিয়ে খুন করেছে মিলিটারি বাহিনী। জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ি। কোনো মতে প্রাণে বেঁচে দুই শিশুসন্তান ও বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে।
এখন ঘরবাড়ি নেই, নেই স্বামীও। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন আয়েশাÑ এমন প্রশ্ন মনে জাগতেই হুহু করে কেঁদে ওঠেন তিনি। দুই কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথায় চেপে বসেছে পাথরের মতো বোঝা। তিনি আল্লাহর কাছে এই হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিচার চেয়েছেন।
একই স্থানে মোস্তাক (৯), আবদুর রহিম (৭) ও লায়লা বেগমকে (৪) নিয়ে আরাকান থেকে পালিয়ে এসেছেন ছমুদা বেগম (৩৩)। কেবল পরনের কাপড়টিই এনেছেন। আরাকানে তাদের জমি ভরা ফসল, গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ ছিল। অথচ গত দুই দিনই তিনিসহ ছেলেমেয়েরা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছে।
ছমুদা বেগম বলেন, খাইনি। খেতে পাবো না, সেটি বড় কথা নয়। নাফ নদী পার হওয়া পর ঘাটের টাকা দিতে পারিনি। তাই ওরা আমার দুই সন্তানকে রেখে দিয়েছে। জনপ্রতি সাত হাজার টাকা (মিয়ানমারের মুদ্রানুসারে) দিতে হবে। তারপর ঘাটওয়ালারা তার সন্তানদের ফেরত দেবেন।
ছমুদা আতঙ্কিত হয়ে বলেন, টাকা দিতে না পারলে ওরা আমার সন্তানদের পুনরায় মিয়ানমারে দিয়ে আসবে। সেখানে মিলিটারি তাদের মেরে ফেলবেÑ এমনটি বলে কেঁদে ফেলেন ছমুদা বেগম।
এ দিকে দীর্ঘ ১৫ দিন হেঁটে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং উংচিফ্রাং দিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন নুর বেগম (২৪)। কোলে ছিল পাঁচ মাসের শিশুপুত্র জানে আলম। ১৫ দিন পানি আর লতাপাতা খেয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মা নুর বেগম। দুধের শিশু জানে আলম অনাহার ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। শুক্রবার রাতে টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে পৌঁছলেও প্রাণের আপন শিশু জানে আলমকে বাঁচানো যায়নি। রাতেই শিশুটি চলে যায় না-ফেরার দেশে। পরদিন শনিবার তাকে দাফন করা হয়।
সন্তানহারা মা নুর বেগম বলেন, চোখের সামনেই দুই শিশুপুত্র মো: হাশিম (৫) ও জাফর আলমকে (৩) পুড়িয়ে মেরেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। স্বামী জামাল হোসেনকে ২০ দিন আগে ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারি ও সন্ত্রাসীরা। সে আর ফেরেনি।
নুর বেগম বলেন, তার চোখের সামনেই অন্তত ৩০ জনেরও বেশি আপনজনকে খুন হতে দেখেছেন। স্বামী-সন্তান আর স্বজন হারিয়ে নির্বাক-নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন হতভাগা মা নুর বেগম।
কেবল নুর বেগম, আয়েশা বেগম অথবা ছমুদা বেগম নন; এ রকম হাজারো মায়ের অসংখ্য শিশু আজ পিতৃহারা, গৃহহারা ও দেশছাড়া। সব হারিয়ে অনেকে সাগরে ভাসছেন, অনেক পালানোর অপেক্ষায় আছেন সীমান্তে। আবার অনেকে বাংলাদেশে এসে বন্দী হয়েছেন জেলখানায়। তবে যেসব শিশু বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। কী হবে তাদের ভবিষ্যৎ? তারা যাবে কোথায়Ñ খাবে কী? আদৌ কি তারা মানুষের মতো করে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে? এমন বহু প্রশ্ন আজ সন্তানহারা রোহিঙ্গা মায়েদের। নয়া দিগন্ত

মন্তব্যসমূহ